সিনথিয়ার বাসায় তার দুই খালাতো বোন ইমি ও শান্তা বেড়াতে এসেছে। ইমির হাতে সিনথিয়ার নতুন মোবাইল সেট। ইমি সেটের অপশন দেখছিল। এমন সময় মোবাইলে মেসেজ আসার রিং বেজে উঠলো। ইমি বললো আপু, শোভন নামে একজন এসএমএস পাঠিয়েছে। পড়তো শুনি। কি লিখেছে। ইমি জোরে জোরে পড়ে শোনালো।

‘গুরু, দুরু দুরু বুকে তোমাকে ভালোবাসা জানিয়েছিলাম, তাই বলে তোমাকে ছাড়া বছর শুরু করতে হবে ভাবিনি। হ্যাপি নিউ ইয়ার।’


শান্তা বললো, সিনথি, তিন মাস পর হ্যাপি নিউ ইয়ার বলার মানে কি? তাও এই স্টাইলে? আর ভাষার কি ছিরি

… তোদের বলিনি গত ডিসেম্বরে আমাদের ক্লাসের এক ছেলে খুবই করুণ গলায় আমাকে প্রেম নিবেদন করেছিল?

তারপর?

তারপর আর কি। আমি ওর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিলাম। কখনো সামনাসামনি দেখা হয়ে গেলে গম্ভীর মুখে পাশ কাটিয়ে চলে যেতাম।

ইমি বললো, এতো ভাব দেখানোর দরকার কি? শোভনের আচরণ আমার কাছে মোটেই আশোভনিয় মনে হচ্ছে না, প্রস্তাবটা বরং আমার কাছে লোভনীয় মনে হচ্ছে।

শান্তা বললো, ভালো কথা, এই ছেলে তোকে গুরু ডাকে?

আর বলিস না, কখনো গুরু, কখনো বস। মহা ফাজিল।

শোন, আমার মনে হয় তোর উচিত এ ফাজিলের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা।

সিনথিয়া কাজিনদের সঙ্গে এ নিয়ে আর কথা বাড়ালো না। পরদিন ক্যাম্পাসে গিয়ে সে শোভনকে খুজলো। শোভন সিনথিয়াকে রিকশা থেকে নামতে দেখেই অন্য রিকশা নিয়ে পালিয়েছে। ক্যাম্পাসের কোথাও খুজে না পেয়ে সিনথিয়া শোভনকে কল দিল।

হ্যালো শোভন?

হ্যা সিনথি, বলো কেমন আছো?

তুই এখনই ক্যাম্পাসে আয়। জরুরি দরকার।

তোমার খুব অসুবিধা না হলে আজকে বাদ দাও। তাহলে আমার একটু সুবিধা হয়।

এখন আসলে তোর কি সমস্যা?

আসলে আমার স্যানডাল ছিড়ে গেছে আর ছেড়া স্যানডাল নিয়ে আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারবো না।

সরি। তুই যদি এখনই না দেখা করিস, তাহলে আমার সেটটা তোর মাথায় ভাঙবো। এটা নতুন সেট, বেশ শক্ত।

ওকে বস, তুমি দুই মিনিট দাড়াও, আমি ১০ মিনিটের মধ্যে আসবো।

***

কেন যেন শোভন সিনথিয়ার সামনে কখনোই ঠিক সহজ হতে পারে না। আজকে মনে হয় শোভন বেশ ভালো বিপদেই পড়বে। এ মুহূর্তে শোভনের পায়ে নতুন জুতা। গতকালই পলওয়েল থেকে ১৬০০ টাকায় কিনেছে। যেহেতু সিনথিয়া তাকে ডেকেছে, অবশ্যই তাকে যেতে হবে। কিš‘ পায়ে ছেড়া স্যানডেলের বদলে নতুন জুতা দেখলে সিনথিয়া নিশ্চয়ই কোনো ভয়ঙ্কর কান্ড করবে। জুতার দাম কিছুটা কম হলে শোভন নিজেই ব্লেড দিয়ে কেটে একটা ব্যবস্থা করতো।

ক্যাম্পাসের কাছেই রনির বাসা। শোভন রনির বাসায় গিয়ে হাজির হলো। রনি মেঝেতে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

রনির এ অবস্থা দেখে শোভন বললো কিরে? তোর কাহিনী কি?

রনি গম্ভীর মুখে জবাব দিল কাহিনী ঝির ঝির, সোমা হ্যা বলেছে।

মানে কি?

সে আমার প্রস্তাবে রাজি হয়েছে।

আরে, এতো খুশির খবর। চিৎ হয়ে আছিস কেন?

রনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো সোমাকে বললাম, তোমাকে না পেলে আমি মারা যাবো। সোমা বললো, হ্যা তাই কর।

আরে ব্যাপার না। এই তোর বাথরুমে যাওয়ার স্যানডেল দেতো।

স্যানডেল নিয়ে লাভ হবে না, বাথরুমে পানি নেই।

আমার স্যানডেল হলেই হবে।

রনি স্যানডেল এনে দিল। শোভন স্যানডেল পায়ে দিয়ে রওনা দিল। রনি অবাক হয়ে বললো, ওটা পরে কোথায় যাচ্ছিস?

ক্যাম্পাসে। ওখানে নিশ্চয়ই পানি আছে।

সিনথিয়ার সামনে এসে দাড়ালো শোভন। সিনথিয়া শোভনের পায়ের দিকে তাকিয়ে বললো কই, তোর স্যানডেল তো ঠিকই আছে?

তোমার কাছে আসবো বলে মুচির কাছ থেকে সারিয়ে আনলাম। এখন বলো কেন ডেকেছো?

আয় একটু রিকশায় উঠি।

কোথায় যাবে?

কোথাও না, এমনি একটু ঘুরবো।

রিকশায় শোভন বেশ জড়সড় হয়ে বসলো। তার একটু ভয় ভয় লাগছে। সে বুঝতে পারছে সিনথিয়া তাকে কিছু কঠিন কথা শোনাবে। সিনথিয়া বললো, শোভন, আমি এখন যে কথাগুলো বলবো মন দিয়ে শুনবি।

আচ্ছা, তার আগে বলো তুমি আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবে না তো। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে তুমি আমাকে ফেলে দেবে।

আমার কথার সরাসরি জবাব না দিলে তাই করবো।

ওকে বস। বলেন কি বলবেন।

তুই আমাকে ভালোবাসিস?

আগে বলো, বাসলে কি হবে আর না বাসলে কি হবে?

ফাজলামো করবি না। সরাসরি উত্তর দে।

ওকে ম্যাডাম, প্রশ্নটা আবার করুন?

তুই আমাকে ভালোবাসিস?

ইয়েস ম্যাডাম।

কেন?

কি, কেন?

কেন ভালোবাসিস?

আমার ভালোবাসায় তোমার কোনো সমস্যা হচ্ছে? আমি ভালোবাসলে তোমার বিশেষ কোনো সমস্যা হলে বলো, এরপর থেকে গোপনে ভালোবাসবো। তুমি টেরও পাবে না।

এতে তোর লাভ কি?

বস, লাভে লাভ নাই। খালি লস।

ফাজিল, ঠিকমতো জবাব দে।

এতক্ষন শোভন সিনথিয়ার দিকে না তাকিয়ে কথা বলছিল। এবার সে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, সিনথিয়া শোনো, আমি তোমার সঙ্গে ব্যবসা করতে আসিনি, লাভ ক্ষতির প্রশ্ন এখানে আসবে কেন? আর ভালোবাসা কোনো গিভ অ্যান্ড টেকের ব্যাপার না যে আমি ভালোবাসলে তোমাকেও বাসতে হবে। আমাকে ভালোবাসার কোনো দরকার তোমার নাও থাকতে পারে। কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসবো, ব্যাস।

এতে তুই শুধু কষ্টই পাবি।

তাও ভালো, খালি হাতে ফেরাচ্ছো না, কিছু একটা দিচ্ছো। না হয় কষ্টটাই নিলাম।

শোভন, আমি এখন যা বলবো তা শুনে তুই প্রচন্ড একটা ধাক্কা খাবি।

তাহলে একটু দাড়াও। হুডটা ধরে নিই, না হলে পড়ে যাবো।

শোভন তোর এসএসসি কবে?

২০০০ সালে।

আমার ৯৮-তে।

এটাই কি তোমার ধাক্কা?

শোন, আমি তোর চেয়ে মিনিমাম দুই বছরের বড়, এ জন্যই আমি সব সময় তোকে তুই করে বলি।

তোমার রেজাল্ট তো খুবই ভালো, ফেল করে আমার সঙ্গে পড়ছো বলে তো মনে হয় না।

এসএসসির পর আমার টাইফয়েড হয়। তার পরের বছর হয় ডেঙ্গ। এ কারণে আমার দুই বছর গ্যাপ ছিল।

তোমার দিক থেকে কোনো সমস্যা না থাকলে আমি এখনো কোনো ধাক্কা খাইনি। বয়স আমার কাছে শুধুই সংখ্যা। ক্যালেন্ডারের পাতা দেখে ভালোবাসা হয় না। আমি এখনো তোমাকে ভালোবাসি।

আমি খুবই অসুস্থ। কোন দিন দেখবি হুট করে মারা যাবো।

ব্যাপার না, তবে তুমি মারা গেলে তোমার কবরে দুটি ফুল নিয়ে যাবো। একটা তোমার কবরে আর একটা তোমার পাশের কবরের জন্য।

আমার পাশে কার কবর হবে?

আমার অনুভূতির। তুমি মারা গেলে আমি হয়তো বেচে থাকবো। তবে অনুভূতিশূন্য হয়ে।

আহা রে, তাহলে তো তুই রোবট হয়ে যাবি, ফাজিল রোবট।

এ রোবট তোকে ভালোবাসলে তুই করে বলা যাবে?

অবশ্যই।

ফাইন। এ রিকশা, কাটাবন চলো, ফুল কিনতে হবে।

Advertisements